সরাসরি ব্রেকিং
সংবাদ লোড হচ্ছে...
The Reform Times
কুরবানির প্রকৃত রূপ: লোকদেখানো উৎসব বনাম আল্লাহর নৈকট্য লাভ
environment

কুরবানির প্রকৃত রূপ: লোকদেখানো উৎসব বনাম আল্লাহর নৈকট্য লাভ

পশু ক্রয়ের প্রতিযোগিতা ও গোশতের হিসাবের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে কি ইব্রাহীমি ত্যাগের মূল চেতনা?

Kazi Salman

Kazi Salman

Editor-in-Chief

May 25, 2026

5 min read

Share Story

বিশেষ প্রতিবেদন | ইসলাম ও জীবন। মুফতি মো: আমিনুল ইসলাম ঢাকা, ২৪ মে, ২০২৬

কুরবানি, যার আভিধানিক অর্থ নৈকট্য অর্জন করা, বা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা। কিন্তু আজ আমাদের সামনে কুরবানির যে রূপ উদ্ভাসিত হয়েছে তা কি আদৌ প্রকৃত চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের সামাজিক লৌকিকতা?

‎​সাধারণ মানুষের চোখে কুরবানি বলতে এখন যা দাঁড়িয়েছে-তাহলো কিছু টাকা দিয়ে গরু, বকরি বা ভেড়া ক্রয় করা আর দিন শেষে গোশত খাওয়া। এটাই কি কুরবানির প্রকৃত রূপ? এই প্রশ্নের উত্তরে সরাসরি 'না' বলা গেলেও, শতভাগ 'হ্যাঁ' বলা মুশকিল। কারণ আমাদের বর্তমান আচার-আচরণ ও সমাজ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এই চিত্রটিই বারবার ফুটে ওঠে। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের এরূপ আচরণ ও মানসিকতা কতটুকু শোভনীয় আর কতটুকু নিন্দনীয়, তা আজ ভেবে দেখার সময় এসেছে। মূলত ধর্মীয় সঠিক জ্ঞানের অভাব ও অজ্ঞতাই এর প্রধান কারণ। তাই কুরবানির প্রকৃত তাৎপর্য সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।

‎​ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ত্যাগের মহিমা

‎​কুরবানির এই মহান বিধানটি মূলত এসেছে হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর যুগ থেকে। মহান আল্লাহ তায়ালা হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-কে তাঁর বৃদ্ধ বয়সে একটি পুত্রসন্তান দান করেছিলেন। স্বাভাবিক মানবীয় নিয়মে বৃদ্ধ অবস্থায় সন্তান লাভ করা অত্যন্ত আনন্দের ও আবেগের বিষয়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় বন্ধু (খলিলুল্লাহ) ইব্রাহীম (আঃ)-কে পরীক্ষার মুখোমুখি করলেন এবং তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি কুরবানি করার নির্দেশ দিলেন। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) আল্লাহর ইশারা বুঝতে বিন্দুমাত্র দেরি করেননি এবং তিনি তাঁর কলিজার টুকরো সন্তান হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কে কুরবানি করতে অগ্রসর হন।

‎​আল্লাহ তায়ালার মূল উদ্দেশ্য ছিল বান্দার তাকওয়া ও আনুগত্য পরীক্ষা করা। যখন ইব্রাহীম (আঃ) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন, তখন আল্লাহ তায়ালা জান্নাত থেকে হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দেন এবং সেটি হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর ছুরির নিচে প্রতিস্থাপিত করে হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কে হেফাজত করেন। আল্লাহ তায়ালার নিকট তাঁর বন্ধুর এই নিঃস্বার্থ ও অনন্য ত্যাগ এতটাই পছন্দ হয়েছিল যে, তিনি কিয়ামত পর্যন্ত অনাগত সকল মুসলিম উম্মাহর জন্য এই নিয়মটি জারি রাখার লক্ষ্যে কুরবানিকে ওয়াজিব বা আবশ্যক করেছেন।

‎​নিয়ত ও শরিয়তের মাসআলা

‎​কুরবানি মূলত সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। কুরবানির ক্ষেত্রে নিয়ত হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এছাড়া কুরবানির পশুর বয়স, শারীরিক সুস্থতা, পশু ক্রয় এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট শত শত মাসআলা-মাসায়েল শরিয়তে বর্ণিত রয়েছে। কিন্তু আজ আমাদের সমাজে কতজন মানুষ এই হুকুমগুলো সঠিকভাবে জেনে কুরবানি করছেন? কুরবানি যেহেতু একটি পবিত্র ইবাদত, তাই এর নিয়ম-নীতির ব্যাপারে অবহেলা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

‎​সমাজে প্রচলিত কিছু মারাত্মক ভুল ধারণা:

‎​১. হাঁস-মুরগি কুরবানির ভ্রান্ত ধারণা: আমাদের সমাজে অনেকের মাঝে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, যাদের গরু বা ছাগল কুরবানি করার সামর্থ্য নেই, তারা একটি মুরগি বা হাঁস জবাই করলে কুরবানির সওয়াব পাবেন। এই ধারণার কোনো প্রকার ইসলামি বা শরিয়তসম্মত ভিত্তি নেই, এটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত।

‎​২. জবাইয়ের সময় নাম উচ্চারণের বাধ্যবাধকতা: অনেকে মনে করেন, পশু জবাইয়ের সময় কুরবানিদাতাদের নাম মুখে উচ্চারণ করা বাধ্যতামূলক। এই ধারণাটির কারণে অনেক সময় নাম পড়তে গিয়ে দেরি হয়, যা পশুর অপ্রয়োজনীয় কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শরিয়ত অনুযায়ী মনে মনে পশুর অংশ বা মালিকানা নির্ধারণ করাই যথেষ্ট, মুখে নাম উচ্চারণ করা জরুরি নয়।

‎​৩. নিয়তে অংশীদারিত্বের গরমিল: একটি পশুতে যখন একাধিক অংশীদার থাকে, তখন প্রত্যেকের নিয়ত খাঁটি হওয়া বাধ্যতামূলক। যদি কোনো একজন অংশীদারের মনে লোকদেখানো ভাব বা গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্য থাকে, তবে বাকিদের কারোর কুরবানিই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। সকলের নিয়ত সহীহ না হলে পুরো কোরবানিই বাতিল বলে গণ্য হবে।

‎​গোশতের হুকুম ও বণ্টন নীতি

‎​কুরবানির গোশত মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য একটি বিশেষ মেহমানদারি। সুতরাং, গোশতের পরিমাণ হিসাব করে বা কতটুকু গোশত পাওয়া যাবে-এই নিয়তে পশু ক্রয় করলে নিয়ত নষ্ট হয়ে যায় এবং কুরবানি বাতিল হয়ে যায়। তবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সর্বদা সুস্থ, সুন্দর ও উন্নত পশু ক্রয় করা উচিত।

‎​আমাদের সমাজে আরেকটি প্রচলিত নিয়ম হলো-কুরবানির গোশত অবশ্যই তিন ভাগ করতে হবে এবং এর ব্যতিক্রম করা যাবে না। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী এটি কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নয়, বরং একটি উত্তম বণ্টন প্রক্রিয়া। কেউ চাইলে সম্পূর্ণ গোশত গরিবদের দান করে দিতে পারে, আবার নিজেরাও খেতে পারে। তবে যেহেতু কুরবানি ত্যাগের উৎসব, তাই সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের বেশি করে দান করাই সর্বোত্তম ও প্রশংসনীয়।

‎​পরিশেষ: একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনে কুরবানির মতো বিস্তৃত বিষয়ের সমস্ত মাসআলা ও হুকুম তুলে ধরা অসম্ভব। তাই পাঠকবৃন্দের প্রতি অনুরোধ, কুরবানির সঠিক নিয়ম ও মাসআলা জানতে যোগ্য আলেম-ওলামাদের শরণাপন্ন হোন এবং সঠিকভাবে ইবাদতটি সম্পন্ন করুন। আল্লাহ আমাদের সবার কুরবানি কবুল করুন। আমীন।

Kazi Salman

Kazi Salman

Editor-in-Chief

Read more from this author

Read Next in environment

দক্ষিণ এশিয়ায় নবায়নযোগ্য সবুজ জ্বালানির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও বাস্তবতা
environment

দক্ষিণ এশিয়ায় নবায়নযোগ্য সবুজ জ্বালানির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

কেন টেকসই সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ গ্রিডে রূপান্তরই জলবায়ু সংকট ও জ্বালানি মূল্যস্ফীতি মোকাবিলার একমাত্র কার্যকর সমাধান।

Kazi Salman
গঙ্গা পানি চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনার আহ্বান বাংলাদেশের
environment

গঙ্গা পানি চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনার আহ্বান বাংলাদেশের

গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নতুন করে আলোচনায় এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

Kazi Salman
5 min read
মুনাফা নাকি পরিবেশ? ফিফা বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাট নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক
environment

মুনাফা নাকি পরিবেশ? ফিফা বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাট নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক

রেকর্ড আয়ের পাশাপাশি রেকর্ড পরিমাণ কার্বন নিঃসরণের পূর্বাভাস পরিবেশবাদী সংস্থাগুলোর; তীব্র সমালোচনার মুখে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্তা সংস্থা।

Kazi Salman
5 min read