নয়াদিল্লি, জুলাই ২০২৬ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারতের রাজধানী দিল্লি উত্তাল ছাত্র-তরুণদের এক বিশাল আন্দোলনে, যাকে অনেকেই ২০২৪ সালের বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করছেন তরুণ নেতৃত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-কেন্দ্রিক সংগঠন এবং সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল ক্ষোভের কারণে।
আন্দোলনের সূত্রপাত
মে মাসে "ককরোচ জনতা পার্টি" (CJP) নামে একটি অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন শুরু হয়, যার প্রতিষ্ঠাতা ডিজিটাল কমিউনিকেশন কৌশলবিদ অভিজিৎ ডিপকে। নামটি এসেছে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্য থেকে, যিনি বেকার তরুণ ও সামাজিক মাধ্যম কর্মীদের "তেলাপোকা" ও "পরজীবী" বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এই অনলাইন আক্রোশ ধীরে ধীরে সরাসরি রাজপথের আন্দোলনে রূপ নেয়।
আন্দোলন জাতীয় দৃষ্টি আকর্ষণ করে যখন লাদাখি পরিবেশবিদ ও শিক্ষা-কর্মী সোনম ওয়াংচুক ২৮ জুন থেকে জন্তর মন্তরে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি দিল্লি পুলিশের নেতৃত্বে পরিবর্তনের পর পুলিশ প্রতিবাদস্থলের ব্যারিকেড সরিয়ে জোরপূর্বক ওয়াংচুককে হাসপাতালে নিয়ে যায়, যা আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে।
দাবি ও পুলিশি দমন
মূলত NEET (জাতীয় মেডিকেল প্রবেশিকা) পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে ক্ষোভ থেকেই আন্দোলনের সূচনা। ২০ জুলাই সোমবার শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। সেদিন সন্ধ্যায় জন্তর মন্তরে ফিরে এসে ডিপকে ভেঙে ফেলা মঞ্চের সামনে প্রায় দুই হাজার বিক্ষোভকারীর উদ্দেশ্যে বলেন, পুলিশ তাদের ছাত্র ও সহযোদ্ধাদের নির্মমভাবে প্রহার করেছে এবং তারা প্রধানের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত পিছু হটবেন না।
Al Jazeera
আন্দোলনকারীদের তিনটি প্রধান দাবি, প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ, ওয়াংচুকের হাসপাতাল থেকে ছাড়, এবং আত্মহত্যা করা পরীক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ। তবে সরকারের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি বলে জানান আন্দোলনের মুখপাত্ররা।
CNN-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিক্ষোভ ভারতের রাজধানীতে বছরের পর বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে, যেখানে তরুণ প্রজন্ম জাতীয় পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার দাবি করছে, যা লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীকে ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে বলে তাদের অভিযোগ। সোমবারের সংঘর্ষে প্রায় দেড়শো বিক্ষোভকারী আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। দশ হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারী সংসদ ভবন অভিমুখে মিছিল করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে, যা এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
CNN
Al Jazeera
বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা কেন?
বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনকে ২০২৪-এর বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে তুলনীয় করে তুলছে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য -তরুণ ও ছাত্রনেতৃত্বাধীন সংগঠন, পরীক্ষা/চাকরি ব্যবস্থার অন্যায় নিয়ে ক্ষোভ থেকে সূত্রপাত, এবং রাষ্ট্রীয় দমননীতির মুখে আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান বিস্তার। New Lines ম্যাগাজিনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পূর্ববর্তী গণআন্দোলনগুলোর তুলনায় এবারের আন্দোলন ভিন্ন, কারণ এতে অংশ নিচ্ছে মূলধারার উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভারতীয় তরুণ প্রজন্ম, যাদের পরিচয়-ভিত্তিক প্রচারণা দিয়ে সহজে "শত্রু" হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন। এতে মোদি সরকারের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বেড়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
New Lines Magazine
বর্তমান পরিস্থিতি
২১ জুলাই কিষান ঘাটে কৃষক সংগঠনগুলোরও পৃথক বিক্ষোভের কর্মসূচি ছিল, যা দিল্লির সার্বিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। মার্কিন দূতাবাস দিল্লিতে ভ্রমণকারীদের সতর্ক থাকতে এবং বিক্ষোভস্থল এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
আন্দোলন এখনো চলমান, এবং এর ভবিষ্যৎ পরিণতি বাংলাদেশের মতোই বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন আনবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে


